চারবারের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন: শিক্ষার আলোয় গড়ছেন আগামী প্রজন্ম*
নিজস্ব প্রতিবেদক,
সততা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও নিরলস পরিশ্রম—এই চার গুণের অনন্য সমন্বয়ে ফটিকছড়ির শিক্ষা অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। চারবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া এই শিক্ষাবিদ বর্তমানে ফটিকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষা-সেবার যাত্রা শুরু হয়। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস সম্পন্ন করা দেলোয়ার হোসেন শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন দক্ষ প্রশিক্ষকও। গণিত বিষয়ে TOT প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষক সমাজের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির ফটিকছড়ি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের হাসনাবাদ খোশালপাড়া গোমস্তা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করা এই শিক্ষকের জন্ম তারিখ ৪ অক্টোবর ১৯৭৬। পিতা মরহুম মোহাম্মদ ছৈয়দুল হক ও মাতা শামসুন নাহারের সন্তান তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী আমেনা আক্তার ও চার সন্তানের জনক।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২, ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে তিনি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে শতভাগ পাসের সাফল্য বজায় রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮৫০ শিক্ষার্থীর প্রাণচঞ্চল পদচারণায় মুখরিত বিদ্যালয়টি এলাকার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
দেলোয়ার হোসেন বিশ্বাস করেন, শিশুরাই বেহেশতের প্রজাপতি।এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিক স্নেহ ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করেন। প্রতিদিন বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলিতে শিশুদের নৈতিকতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম, নামাজ ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর মতে, শুধু ভালো ফলাফল নয়, একজন আদর্শ মানুষ গড়ে তোলাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
বিদ্যালয়ের সার্বিক মানোন্নয়নে তিনি নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ, ফোনে যোগাযোগ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং আনন্দময় পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করেন। ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থী ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা তদারকি ও সহায়তার ব্যবস্থাও করেছেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের কাছে যাওয়ার মাধ্যমেই তাদের মনোজগৎ বোঝা সম্ভব।
দেলোয়ার হোসেন বলেন,
“আমি বিদ্যালয়কে নিজের পরিবারের মতো ভালোবাসি। শিক্ষার্থীদের হাসিমুখ, অভিভাবকদের আস্থা এবং সহকর্মীদের সহযোগিতাই আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। একজন শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমার কোনো শিক্ষার্থী ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।”
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন,
“কোনো কাজকে কঠিন মনে করবে না। নিয়মিত পরিশ্রম, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সফলতা অবশ্যই আসবে। স্বপ্ন দেখতে হবে, আর সেই স্বপ্ন পূরণে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।”
সততা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে ধারণ করা এই শিক্ষকের স্বপ্ন—ফটিকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয় পর্যায়ে আরও গৌরবময় অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের আদর্শ, দেশপ্রেমিক ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁর মতো শিক্ষকদের হাত ধরেই আলোকিত হবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
Leave a Reply