দেশসেরার মুকুটে টানা তিনবার: নেপচুন চা-বাগানের জেসমিন আক্তারের অনন্য কীর্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক,ফটিকছড়ি:
বাংলাদেশের চা শিল্পে আবারও গৌরবের নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নেপচুন চা-বাগানের শ্রমিক জেসমিন আক্তার। সারাদেশের ১৬৮টি চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো দেশসেরার স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ‘শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী’ নির্বাচন প্রতিযোগিতায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে জেসমিন আক্তার এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পর্যায়ের এ সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করার কথা রয়েছে তাঁর।
চা শিল্পে মানসম্মত উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে এই জাতীয় পুরস্কার অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ শ্রমিকদের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে দেশের চা শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।
১৯৬০ সালে ফটিকছড়ির পাহাড়-সমতল মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ একর এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্পাহানি গ্রুপের নেপচুন চা-বাগান। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ে বাগানটি নানা অর্জনের সাক্ষী হয়েছে। ২০০৯ সালে বৃক্ষরোপণে দেশসেরা এবং ২০২০ সালে গ্রীন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হওয়ার গৌরব অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। এবার টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারীর স্বীকৃতিও এ বাগানের ঝুলিতে যোগ হলো।
জানা যায়, জেসমিন আক্তার মাত্র ৩০ মিনিটে ১৩ কেজি চা-পাতা চয়ন করতে সক্ষম হন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৫৮ বছর। গত এক বছরে তিনি সংগ্রহ করেছেন ২৬ হাজার ২১৭ কেজি চা-পাতা। ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৪৯ কেজি পাতা সংগ্রহের দক্ষতা তাঁকে দেশের সেরা শ্রমিকদের কাতারে নিয়ে এসেছে।
জেসমিন আক্তার বলেন,
মাত্র ১৬ বছর বয়সে কুমিল্লা থেকে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে নেপচুন চা-বাগানে আসি। সংসার জীবনের শুরু থেকেই চা-বাগানের কাজে যুক্ত আছি। দীর্ঘ ৪২ বছরের শ্রম ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে পরপর তিনবার দেশসেরা হওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। এই সম্মান শুধু আমার নয়, আমার পরিবার ও সহকর্মীদেরও।
বর্তমানে তাঁর পরিবারের আটজন সদস্যই বাগানের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
নেপচুন চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মো: রিয়াজ উদ্দিন বলেন,
জেসমিন আক্তারের এই অর্জন শুধু একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি নেপচুন চা-বাগানের দীর্ঘদিনের শ্রম, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রতিফলন। দেশের শতাধিক চা-বাগানের মধ্যে আমাদের শ্রমিকেরা ধারাবাহিকভাবে সেরা হওয়ার যে নজির স্থাপন করেছেন, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। জেসমিনের অধ্যবসায়, কর্মনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব নতুন প্রজন্মের শ্রমিকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, কল্যাণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এই অর্জন প্রমাণ করে, সুযোগ ও উৎসাহ পেলে আমাদের শ্রমিকরাও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা দেখাতে সক্ষম। ভবিষ্যতেও উৎপাদন, গুণগত মান ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে নেপচুন চা-বাগান দেশের চা শিল্পে নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখতে কাজ করে যাবে।
টানা তিনবার দেশসেরা হওয়ার মধ্য দিয়ে জেসমিন আক্তার শুধু নিজের নামই উজ্জ্বল করেননি, ফটিকছড়ি ও বাংলাদেশের চা শিল্পকেও নতুন করে গর্বিত করেছেন।
Leave a Reply