জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনবান্ধব জ্বালানি নীতি’র আলোচনা সভায় গণসংহতি আন্দোলন কমিটির ন্যায্য ও খাতভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের দাবি
বিশেষ প্রতিনিধি:
বুধবার ২২শে এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবের ঢাকা জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে গণসংহতি আন্দোলন আয়োজিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনবান্ধব জ্বালানি নীতি শীর্ষক আলোচনা সভার সভাপতি গণসংহতির আন্দোলন-জিএসএর প্রধান সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) দেওয়ান আব্দুর রশিদ নীলু বলেছেন, জ্বালানির ন্যায্য ও খাতভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন আরও,আমরা অতীতে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর ও খনিজসম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির আন্দোলন থেকে সরকারকে তার নীতি পরিবর্তনের যে পরামর্শ দিয়েছিলাম, সেটা সরকার মানেনি,এখনও সরকার যদি এই পরামর্শগুলো না শোনে, ভুল নীতি ও দুর্নীতি যদি এখান থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা না যায়, তাহলে জ্বালানি সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে।
সভার সূচনা বক্তব্যে জিএসএর নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি মানেই খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, অর্থাৎ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেন তুলনামূলকভাবে সীমিত ও উচ্চ আয়ের ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়।
এই বাস্তবতায় মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। জ্বালানির দাম নির্ধারণ করতে হবে—কোন খাতে তা ব্যবহার হচ্ছে, সেই খাতের জাতীয় উৎপাদনে কী ভূমিকা, সেই খাতের ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কতটুকু ইত্যাদি এসব বিবেচনায় নিয়ে,জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি জনবান্ধব জ্বালানি নীতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য প্রয়োজন ন্যায়সঙ্গত মূল্য নির্ধারণ, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং একটি টেকসই, স্বনির্ভর ও ন্যায্য জ্বালানি কাঠামো—যা দেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।
বর্তমান সংকট আমাদের আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে একটি আমদানিনির্ভর কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ না করে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রসর না হয়ে, এলএনজি, তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করা হয়েছে,রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে যে ব্যাপক লুণ্ঠন হয়েছে, তার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পূর্বে নেওয়া প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা এসব প্রকল্পে যুক্ত ছিল, তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের মাধ্যমে নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। এই খাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে করছাড় দিতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ, কৃষিজমিতে সেচের জন্য সৌর বিদ্যুৎ, উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, জ্বালানির অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব ছাড়া কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হতে পারে না। একদিকে দেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, অন্যদিকে জ্বালানির জন্য একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বৈশ্বিকভাবে অনেকগুলো উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বহু দেশের ওপর ছিল। সব দেশ সেগুলো মানেনি, সব দেশকে সেগুলো মানতে বাধ্য করা যায়নি। আমরাই বরং যেচে পড়ে স্বেচ্ছায় তাদের অনেক নিষেধ মেনেছি। আমাদের ভৌগলিক আয়তন যাই হোক না কেন, আমরা যদি রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদেরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারি, আমাদের মর্যাদাবোধকে যদি সে জায়গায় নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমরা এই ধরনের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক চাপকে এড়িয়ে গিয়ে নিজেরা স্বাধীনভাবে জ্বালানি নীতি নির্ধারণ করতে পারব।
জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, জ্বালানি সংকট হলে শিল্প-কলকারখানা ও কৃষিতে বড় রকমের চাপ তৈরি হয়। উৎপাদন খরচ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। এই ধরনের সংকটের সময় সরকার কাদেরকে সুরক্ষা দেবে, কাদেরকে অগ্রাধিকার দেবে সেগুলো নিয়ে নীতিমালা হওয়া দরকার।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, যেভাবে বিগত সরকার কাঠামোগতভাবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা করে গেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, সেই কাঠামো পরিবর্তন হয়নি। কাঠামো ভেঙে এই সরকার জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আসেনি। যে ব্যবস্থাপনা ছিল, সে ব্যবস্থাপনার ওপরেই সরকার বসেছে,জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সকল অংশই কাঠামোগত দুর্নীতির সুবিধাভোগী। এই কাঠামো ভাঙার জন্য সরকারকেই শক্তিশালী হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, যখন কোনো সংকট হাজির হয় তখনই বিশেষজ্ঞদের কথা বলতে বলা হয়। কিন্তু যখন সংকট থাকে না তখন এই কথাগুলো কেউ শুনতে চায় না,জ্বালানিখাতে বিনিয়োগের সময় আমরা কত টাকা ভবিষ্যতে সাশ্রয় করতে পারব সেটা আমাদের চিন্তায় থাকতে হবে। আমাদের চিন্তা করতে হবে শিল্পে আমাদের জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ নিয়ে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. হাসান আশরাফ বলেন, জ্বালানি শুধু বিদ্যুৎ, তেল বা গ্যাস নয়, এটি একটি সামাজিক শক্তি। জ্বালানিকে কেবল ইউনিট বা মেগাওয়াটের হিসেবে না দেখে বরং একে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
যে তথাকথিত উন্নয়নের মডেলের মধ্যে বাংলাদেশ ধরে আছে, সেখানে যে আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে, সেখানে বিকল্প জ্বালানি, নবায়নযোগ্য উৎস খোঁজা উপেক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় আটকে রয়েছে।
জিএসএর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য গোলাম মোস্তফার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অংশ নেন জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য মনির উদ্দিন পাপ্পু, সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ রুমী, কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নাজার আহমেদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য দীপক কুমার রায়, ইখতিয়ার উদ্দিন বিপা, মনিরুল হুদা বাবন, লুভানা তাবাসসুম, সাইফুল্লাহ সিদ্দিক রুমন, তাহসিন মাহমুদ প্রমুখ।
Leave a Reply