
চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া তফসিলের অপেক্ষায় ক্রীড়াঙ্গন
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, হতাশা আর মাঠে খেলা না থাকার গুমোট পরিবেশ পেছনে ফেলে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) সিজেকেএসের নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের পর থেকেই স্টেডিয়াম অঙ্গনে একটাই আলোচনা-কবে আসছে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের তফসিল, আর কবে ফিরবে খেলাধুলায় প্রাণচাঞ্চল্য।
গত ১০ই মার্চ এনএসসি পূর্বের অ্যাডহক কমিটি বিলুপ্ত করে। পরে ১৩ই এপ্রিল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম মিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব আগামী ৯০ দিনের মধ্যে, অথবা দ্রুততম সময়ে, সিজেকেএস নির্বাচন আয়োজন করা। একই প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম জেলা ছাড়াও জেলার ১৫ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটিও ঘোষণা করা হয়।
নতুন এই বাস্তবতায় চট্টগ্রামের ক্রীড়া সংগঠক, ক্লাব প্রতিনিধি ও খেলোয়াড়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। অনেকের মতে, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় মাঠের খেলাধুলা প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে।
নিয়মিত প্রতিযোগিতা না থাকায় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেও পড়েছে প্রভাব। ফলে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
এনএসসির নিয়ম অনুযায়ী, জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন আয়োজনের আগে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এরপরই হবে বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন। ফলে জেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে কয়েকটি সাংগঠনিক ধাপ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সিজেকেএসের সদ্য ঘোষিত অ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য জেলা প্রশাসন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও ক্রীড়া সংগঠকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থায় অ্যাডহক কমিটি গঠন হলেও মাঠের কার্যক্রমে খুব বেশি গতি আসেনি। সেই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে সম্ভাব্য নির্বাচনকে ঘিরে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। ক্রীড়া সংগঠকদের বিশ্বাস, নির্বাচিত নেতৃত্বই পারে স্থবির ক্রীড়াঙ্গনে গতি ফেরাতে এবং হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে।
অনেক সংগঠক মনে করছেন, শুধু নির্বাচন করলেই হবে না; শক্তিশালী সাব-কমিটি গঠন করে সেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলা সাবেক ক্রীড়াবিদদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলেই পরিকল্পিতভাবে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতারসহ সব খেলায় নতুন প্রাণ ফিরবে।
দীর্ঘদিনের হতাশা পেরিয়ে এখন চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে একটাই প্রশ্ন-তফসিল কবে? আর সেই উত্তরেই লুকিয়ে আছে মাঠে খেলা ফেরার নতুন স্বপ্ন।
এদিকে, নির্বাচনকে সামনে রেখে স্টেডিয়ামপাড়ায় ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। কেউ কেউ প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আবার অনেকে তফসিল ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন। যদিও অনেকেই এখনো কোন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি। তবু সর্বত্রই এখন নির্বাচনী আলোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক পদ ঘিরে সবচেয়ে বেশি চর্চা চলছে।
এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহ দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, সিজেকেএস’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ক্রীড়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীম, চট্টগ্রাম জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাবেক ফুটবলার এস এম শহিদুল ইসলাম, ক্রীড়া সংগঠক মো. মশিউল আলম স্বপনসহ আরও কয়েকজন।
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর দৈনিক চট্টগ্রামের আলো’ কে বলেন, আমি সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে খেলাধুলাকে আবারও সক্রিয় ও গতিশীল করাই আমার মূল লক্ষ্য। আমি বিশ্বাস করি, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্বই সামনে আসবে। কাউন্সিলররা যদি আমাকে দায়িত্ব দেন, তাহলে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন, সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল করা, নতুন খেলোয়াড় তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি এবং অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠকদের নিয়ে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তুলতে কাজ করব।
হাফিজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, নির্বাচিত হলে প্রথমেই মাঠ সংকট নিরসনে নগর ও উপজেলা পর্যায়ের মাঠগুলোকে খেলাযোগ্য করে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে চাই। উপজেলা থেকেই নতুন খেলোয়াড় উঠে আসবে। পাশাপাশি দক্ষ কোচ, প্রশিক্ষক ও সংগঠক তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। স্কুলভিত্তিক খেলাধুলা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রতিভাবান খেলোয়াড় পাওয়া যাবে। আমি চাই সুষ্ঠু নির্বাচন হোক এবং নির্বাচিত নেতৃত্ব ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন পথে এগিয়ে নিক।
সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে ক্রীড়া সংগঠক সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীম বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে কাজ করেছি। আমি বিশ্বাস করি, চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে কাউন্সিলররা সবসময় যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকেই বেছে নেন। নির্বাচিত হলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নিয়মিত খেলা আয়োজন, মাঠের কার্যক্রম সচল করা এবং চট্টগ্রামের খেলাধুলাকে আবারও গতিশীল করাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য। আমি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করছি এবং ক্রীড়া সংগঠকদের সমর্থন কামনা করছি।
চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ নির্বাচন হয়। এরপর ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অ্যাডহক কমিটি গঠিত হলেও প্রায় দেড় বছরে তেমন খেলাধুলা আয়োজন হয়নি, ফলে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন লিগ ব্যাহত হয়েছে।
তিনি বলেন নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করবে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘদিনের ক্রীড়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামের খেলাধুলাকে আবারও সচল ও গতিশীল করাই তার লক্ষ্য।
শুধু সাধারণ সম্পাদক পদই নয়, সহ-সভাপতি, অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদেও লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে। এসব পদে আলোচনায় রয়েছেন সিজেকেএস’র সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল বশর, সিজেকেএস ক্লাব সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহীন আফতাবুর রেজা চৌধুরী, ক্রীড়া সংগঠক মাকসুদুর রহমান বুলবুল, সিজেকেএস ক্লাব সমিতির অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক আ.ন.ম ওয়াহিদ দুলাল, সাবেক জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কারাতে খেলোয়াড় শাহজাদা আলম, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, সাবেক সিজেকেএস কোষাধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন মো. জাহাঙ্গীর, মো. শাহজাহান, এ কে এম আব্দুল হান্নান (আকবর), মাহবুবুল আলম ও মো. সরওয়ার আলম চৌধুরী (মনি)।
নির্বাহী সদস্য পদেও আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা কম নয়। এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানিয়েছেন গোলাম মহিউদ্দীন হাসান, নাসির মিঞা, আলী হাসান রাজু, কল্লোল দাস, সাইফুল আলম খান, এম এ মুছা বাবলু, শওকত হোসাইন, রায়হান উদ্দিন রুবেল, মো. হারুণ রশিদ, জসীম আহমেদ, হারুন আল রশীদ, মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, এ এস এম সাইফুদ্দিন চৌধুরী, আখতারুজ্জামান, ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিনসহ আরও অনেকে। তবে চূড়ান্ত কাউন্সিলর তালিকা প্রকাশের পর এ তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে।
ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, নতুন কমিটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মাঠের কার্যক্রম সচল করা। নিয়মিত ফুটবল ও ক্রিকেট লিগ আয়োজন, অন্যান্য ডিসিপ্লিনে প্রতিযোগিতা চালু, ক্লাবগুলোর কার্যক্রম সক্রিয় করা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে খেলাধুলা বিস্তৃত করা। এছাড়া বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচি, নতুন খেলোয়াড় তৈরি, ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন, মাঠ সংস্কার, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া। পাশাপাশি ক্রীড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো।
সব মিলিয়ে, সিজেকেএস নির্বাচন এখন চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। নির্বাচন কমিশন গঠন ও তফসিল ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো ক্রীড়াঙ্গন। নতুন নেতৃত্বই ঠিক করবে আগামী দিনে চট্টগ্রামের ক্রীড়ার গতি ও দিকনির্দেশনা।
Leave a Reply